নিজস্ব প্রতিবেদক

সংলাপ নয়, লাঠিচার্জ: পোশাক শ্রমিক আন্দোলন কোন পথে?



সংলাপ নয়, লাঠিচার্জ: পোশাক শ্রমিক আন্দোলন কোন পথে?

সুষ্ঠু শ্রমিক আন্দোলন সরকারি দমন-পীড়নের মুখে: বেঁচে থাকার জন্য পোশাক শ্রমিকদের সংগ্রাম

দেশের অর্থনীতির চাকা যে শ্রমিকদের ঘামে সচল থাকে, আজ তারাই বেঁচে থাকার তাগিদে রাজপথে নেমে দমন-পীড়নের শিকার। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের মতো মৌলিক দাবিতে গড়ে ওঠা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ শ্রমিক আন্দোলন আজ কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মুখোমুখি।

পেটের দায়ে রাজপথে

গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক ইস্যুতে নয়, একেবারেই জীবন-জীবিকার প্রশ্নে। 

একজন নারী শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বাজারে চালের কেজি ৭০ টাকা, বাড়ি ভাড়া ৫ হাজার। ১২ হাজার টাকা বেতনে বাচ্চা নিয়ে বাঁচবো কীভাবে? আমরা তো বেশি কিছু চাইনি, শুধু বাঁচার মতো একটা বেতন চেয়েছি।”

শ্রমিকদের মূল দাবিগুলো স্পষ্ট:

১.  বর্তমান বাজারমূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ

২.  ওভারটাইমের সঠিক হিসাব ও যথাসময়ে পরিশোধ

৩.  কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, হয়রানি বন্ধ ও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার

৪.  বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে ছাঁটাই ও কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ করা

শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে দমন-পীড়নের অভিযোগ

আন্দোলনের শুরুতে শ্রমিকরা কারখানার সামনে মানববন্ধন ও সড়কের পাশে অবস্থান কর্মসূচি পালন করলেও, গত কয়েকদিনে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ মিছিলে লাঠিচার্জ, জলকামান ব্যবহার এবং নির্বিচারে মামলা ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। অনেক কারখানায় আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের হাজিরা বাতিল করে বরখাস্তের চিঠি দেওয়া হয়েছে।

একজন শ্রমিক নেতা বলেন, “আমরা যখনই আমাদের অধিকারের কথা বলি, তখনই আমাদের ওপর ‘বহিরাগত’, ‘উস্কানিদাতা’ তকমা লাগিয়ে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়। শ্রমিকরা কারো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে না, তারা নিজের পেটের এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নেমেছে।”

এ পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় কয়েকশো অজ্ঞাত শ্রমিককে আসামি করে মামলা দায়েরের খবর পাওয়া গেছে, যার ফলে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক বিরাজ করছে।

অর্থনীতির চালিকাশক্তি কেন অবহেলিত?

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, যাদের সিংহভাগই নারী, এই শিল্পকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করেছে।

অথচ যারা “মেড ইন বাংলাদেশ” ট্যাগকে বিশ্বমানের করেছেন, তাদের জীবনমান এখনো মানবেতর। একদিকে মালিকপক্ষের লাভের অঙ্ক বাড়ছে, অন্যদিকে শ্রমিকের জীবন চলছে ঋণ আর টানাপোড়েনে।

শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দমন-পীড়ন দিয়ে সাময়িকভাবে আন্দোলন থামানো গেলেও, সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। শ্রমিক অসন্তোষকে আইনশৃঙ্খলা সমস্যা হিসেবে না দেখে, এটিকে একটি অর্থনৈতিক ও মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে।

সমাধান কোথায়?

সুষ্ঠু শিল্প সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন ত্রিপক্ষীয় সংলাপ – সরকার, মালিক এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে খোলামেলা আলোচনা। শ্রমিকদের ভয় দেখিয়ে নয়, তাদের কথা শুনে এবং ন্যায্য দাবি মেনে নিয়েই এই সংকটের সমাধান সম্ভব।

পোশাক শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দিতে চান না, তারা কাজ করেই বাঁচতে চান। তাদের এই বাঁচার লড়াইকে সম্মান জানানো রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। কারণ শ্রমিক বাঁচলেই শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলেই বাঁচবে বাংলাদেশ।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *